
হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বেলাল
আমার শিক্ষা, আমার স্বপ্ন—আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসা
বিশেষ করে আমার মা ছিলেন অত্যন্ত আমলদার ও পরহেজগার একজন নারী। তিনি নিয়মিত নামাজ ও রোজা পালন করতেন, পর্দার ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। তাঁর সুন্দর আচার-আচরণ ও চরিত্র ছিল আমাদের পরিবারের জন্য অনুকরণীয়। ফজরের নামাজের পর নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করতেন তিনি। মায়ের সেই পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি ও ইসলামী পরিবেশই আমার হৃদয়ে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে।
সেই কুরআনের আলোকে পথচলা শুরু। আলহামদুলিল্লাহ, পরবর্তীতে পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করার সৌভাগ্য অর্জন করি।
কিতাবি শিক্ষার পথে
২০০৯ সালে ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে শাইখুল হাদিস আল্লামা ক্বারী আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মাদরাসায় কিতাব বিভাগে ভর্তি হই। তখন তিনি স্থানীয় একটি মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর সান্নিধ্যে থেকে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয়। পরবর্তীতে আলহামদুলিল্লাহ, দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করি। এরপর শুরু হয় দ্বীনের খেদমতের নতুন অধ্যায়।
আমার শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ আল্লামা মুফতি জামাল উদ্দিন সাহেবের বাড়ির মাদরাসায় মাদারীপুরে প্রায় সাত বছর দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে নিয়োজিত ছিলাম। সেই সময় থেকেই মনে একটি স্বপ্ন লালন করতাম—নিজ এলাকায় এমন একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব, যেখানে শিশু-কিশোররা পবিত্র কুরআনের শিক্ষা লাভ করবে এবং সুন্দর চরিত্র ও আদর্শ জীবন গড়ে তুলবে।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার পথে
অবশেষে সেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করে।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আমার বয়স যখন মাত্র ২৩ বছর, তখন প্রতিষ্ঠিত হয় আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসা।
সেদিন আমার হৃদয়ে যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বহুদিন ধরে লালন করা একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ নিতে দেখে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলাম।
আমার মা ও উস্তাদদের কাছ থেকে পাওয়া কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শকে সামনে রেখে ছোটবেলা থেকে যে পথচলা শুরু করেছিলাম, সেই পথেই নিজেকে, পরিবারকে এবং সমাজকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
কেন আল হেরা মদিনাতুল উলুম?
আমি দেখেছি, আমাদের সমাজের অনেক শিশু-কিশোর পর্যাপ্ত দ্বীনি শিক্ষা ও কুরআনের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আধুনিকতার ব্যস্ততায় অনেক পরিবারে সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তাই মনে হলো—শুধু নিজের জন্য দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না; বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে এলাকার সন্তানরা নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে কুরআন, হাদিস ও ইসলামী আদর্শের শিক্ষা লাভ করতে পারে।
সেই চিন্তা থেকেই শুরু হলো আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসার পথচলা।
আল্লাহর অশেষ রহমত, বরকত এবং কিছু দ্বীনপ্রেমী আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ, দাতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন দক্ষ ক্বারী, হাফেজ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী। তাঁদের আন্তরিক পরিশ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসায় মাদরাসার শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
কুরআনের সুমধুর ধ্বনিতে মুখরিত মহিষকাটা
আলহামদুলিল্লাহ, অল্প সময়ের মধ্যেই ১২০ জন শিক্ষার্থী ও ৮ জন শিক্ষক নিয়ে নিয়মিত কুরআন শিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়।
মহিষকাটা বাজারের উত্তর মাথায় মাদরাসা প্রাঙ্গণ আজ পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনিতে মুখরিত। শিশুদের কণ্ঠে যখন কুরআনের আয়াত উচ্চারিত হয়, তখন পুরো পরিবেশে এক অপূর্ব প্রশান্তির আবহ তৈরি হয়।
মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যখন পথচারী, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে সালাম বিনিময় করে, তখন সেই দৃশ্য আমাদের হৃদয়কে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
একজন শিশু যখন তার বাবা-মাকে সম্মানের সঙ্গে সালাম দেয়, তখন সন্তানের প্রতি মায়ের-বাবার ভালোবাসা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। এসব ছোট ছোট পরিবর্তনই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আবাসিক শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ
বর্তমানে আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসায় ১২০ জন আবাসিক শিক্ষার্থী থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
আবাসিক শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালিত হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল ও পরিপাটি নিয়মের মধ্যে। পড়াশোনার পাশাপাশি কুরআন তিলাওয়াত, ইবাদত, আদব-আখলাক ও নৈতিক শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আমাদের লক্ষ্য শুধু একজন শিশুকে হাফেজ বানানো নয়; বরং তাকে কুরআনের আলোয় আলোকিত, উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সমাজের জন্য একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্য
আলহামদুলিল্লাহ, দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্বারী-হাফেজ এবং পরিশ্রমী শিক্ষকমণ্ডলীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান ক্রমাগত উন্নত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে—
- ২০২১ সালে: হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ আয়োজিত জেলা পর্যায়ের হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসার দুইজন শিক্ষার্থী যথাক্রমে ২য় ও ৩য় স্থান অর্জন করে।
- ২০২২ সালে: উপজেলা পর্যায়ে ১১টি এবং জেলা পর্যায়ে ৭টি পুরস্কার অর্জন করে।
- ২০২৩ সালে: উপজেলা পর্যায়ে ১০টি পুরস্কার অর্জন করে।
- ২০২৪ সালে: শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ১৬টি পুরস্কার অর্জন করে।
এসব অর্জন আমাদের জন্য শুধু পুরস্কার নয়; বরং এটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
আমাদের স্বপ্ন আরও বড়আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসার পথচলা এখনো অনেক দূর। আমরা চাই, এই প্রতিষ্ঠান থেকে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হোক যারা পবিত্র কুরআনের হাফেজ হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞান, আমল, আদব, আখলাক ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ হবে।
আমরা চাই—এই মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মসজিদ, মাদরাসা ও সমাজে দ্বীনের খেদমত করবে এবং মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করবে।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আপনাদের দোয়া, ভালোবাসা, পরামর্শ ও সহযোগিতা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মহান আল্লাহ যেন আল হেরা মদিনাতুল উলুম মাদরাসার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে কবুল করেন, এর শিক্ষা কার্যক্রমে বরকত দান করেন এবং এখান থেকে অসংখ্য হাফেজ, আলেম, ক্বারী ও আদর্শ মানুষ তৈরি হওয়ার তাওফিক দান করেন।
আপনাদের সকলের কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া চাই—আল্লাহ যেন আমাদের এই পথচলাকে কবুল করেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের খেদমত করার তাওফিক দান করেন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
